নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ
সময় বৃদ্ধি চাওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি ব্যর্থতার স্বীকৃতি
- আপলোড সময় : ২৫-০২-২০২৬ ০৪:২৬:২৯ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৫-০২-২০২৬ ০৪:২৬:২৯ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রতি বছর এখানকার কৃষকরা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করে ফসল ঘরে তোলেন। এই বাস্তবতায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং কৃষকের জীবন-জীবিকা রক্ষার অপরিহার্য পূর্বশর্ত। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে অধিকাংশ বাঁধের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, এবং সময় বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিঠি প্রস্তুত করছে। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়, বরং একটি দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি।
সরকার প্রতিবছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে হাওরের ফসল রক্ষায় উদ্যোগ গ্রহণ করে। চলতি বছরও প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০২টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও কেন সময়মতো কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না? কেন প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, পিআইসি গঠনে অনিয়ম, এবং ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ বারবার সামনে আসছে? এসব অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রকল্পে গণশুনানি ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, অক্ষত বাঁধে অপ্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, আবার প্রয়োজনীয় স্থানে কাজই শুরু হয়নি। এতে বোঝা যায়, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পরিকল্পনার ঘাটতি এবং স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও আন্দোলনের পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শনে কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা প্রশাসনের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়া কঠিন। প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে দায়বদ্ধতার অভাব থাকলে এর খেসারত দিতে হয় কৃষকদের, যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন।
হাওরের ইতিহাস সাক্ষী- একটি বাঁধের সামান্য ত্রুটি বা বিলম্বিত কাজ পুরো অঞ্চলের ফসল ধ্বংস করে দিতে পারে। এতে শুধু কৃষক নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই প্রকল্পগুলোকে সাধারণ উন্নয়ন কাজ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় কৃষক ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, যাতে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ স¤পন্ন হয়। সর্বোপরি, নির্ধারিত সময়সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
হাওরের কৃষকরা প্রতি বছর একই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন- এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সময় বৃদ্ধি চাওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি ব্যর্থতার স্বীকৃতি। এখনই প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং কঠোর নজরদারি। অন্যথায় প্রতিবছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী কৃষক সমাজ।
হাওর রক্ষা শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি দায়িত্ব- রাষ্ট্রের, প্রশাসনের এবং সংশ্লিষ্ট সকলের। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য হতে পারে না।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়